Skip to content

যদি ব্রেন টিউমার আবার ফিরে আসে, তবে কি দ্বিতীয়বার অপারেশন করা সম্ভব?

ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত রোগী ও তাঁদের পরিবারের কাছে সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয়গুলোর একটি হলো—টিউমার আবার ফিরে আসা (Brain Tumor Recurrence)। প্রথমবার সফল অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসার পরও চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

তবে প্রশ্ন হলো: যদি ব্রেন টিউমার আবার ফিরে আসে, তবে কি দ্বিতীয়বার অপারেশন বা সার্জারি করা সম্ভব?

সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—হ্যাঁ, ব্রেন টিউমার আবার ফিরে আসলে দ্বিতীয়বার (এবং কিছু ক্ষেত্রে একাধিকবার) অপারেশন করা সম্পূর্ণ সম্ভব। তবে প্রথম সার্জারির মতো দ্বিতীয়বার অপারেশন সিদ্ধান্তটি সরল নয়; এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে রোগীর শারীরিক অবস্থা, টিউমারের ধরন, অবস্থান এবং পূর্ববর্তী চিকিৎসার ওপর।

১. ব্রেন টিউমার কেন আবার ফিরে আসে (Recurrence)?

অস্ত্রোপচারের সময় নিউরোসার্জনরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন পুরো টিউমার অপসারণ (Total Resection) করতে। তা সত্ত্বেও কিছু মাইক্রোস্কোপিক সেল বা কোষ মস্তিষ্কের সুস্থ টিস্যুর গভীরে রয়ে যেতে পারে, যা সাধারণ চোখে বা স্ক্যানে দেখা যায় না। সময়ের সাথে সাথে এসব কোষ থেকে নতুন করে টিউমার জন্ম নিতে পারে।

  • ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যানসারযুক্ত টিউমার (যেমন: Glioblastoma): এ ধরনের টিউমার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পুনরুত্থানের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।
  • বিনাইন বা অ-ক্যানসারযুক্ত টিউমার (যেমন: Meningioma, Pituitary Adenoma): এগুলো অত্যন্ত ধীরগতিতে বাড়ে, তবে সম্পূর্ণ রিমুভ করা না গেলে কয়েক বছর পর আবার দেখা দিতে পারে।

২. দ্বিতীয়বার অপারেশনের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়?

দ্বিতীয় সার্জারির (Re-operation / Re-resection) সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিউরোসার্জন এবং মেডিকেল বোর্ড (Multidisciplinary Team) বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করেন:

(ক) টিউমারের অবস্থান (Location)

টিউমারটি মস্তিষ্কের কোন অংশে ফিরে এসেছে তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি এটি মস্তিষ্কের কোনো স্পর্শকাতর বা গুরুত্বপূর্ণ অংশে থাকে (যেমন: বাকশক্তি, দৃষ্টিশক্তি বা অঙ্গ সঞ্চালনের কেন্দ্র), তবে সার্জারি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

(খ) রোগীর সার্বিক শারীরিক অবস্থা (Performance Status)

রোগীর দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা, বয়স, হার্ট বা কিডনির অবস্থা এবং পূর্ববর্তী সার্জারি ও রেডিওথেরাপির ধাক্কা সামলে ওঠার সক্ষমতা আছে কি না—তা মূল্যায়ন করা হয়।

(গ) প্রথম সার্জারির পর সময়কাল (Time Elapsed)

প্রথম অপারেশনের কতদিন পর টিউমারটি ফিরে এসেছে? যদি কয়েক বছর পর ফিরে আসে, তবে পুনরায় অপারেশন সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিন্তু যদি মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে দ্রুত ফিরে আসে, তবে সার্জারির সাথে সাথে বিকল্প চিকিৎসার কথা ভাবতে হয়।

(ঘ) টিউমারের গ্রেড ও প্যাথলজি পরিবর্তন

কখনও কখনও ধীরগতির টিউমার (Low-grade) দ্বিতীয়বার ফিরে আসার সময় উচ্চমাত্রার বা দ্রুত বর্ধনশীল (High-grade) টিউমারে রূপান্তরিত হতে পারে। বায়োপসি ও এমআরআই (MRI) পর্যবেক্ষণ করে অপারেশনের উপযুক্ততা নির্ধারণ করা হয়।

৩. দ্বিতীয়বার অপারেশনের সুবিধা বা লক্ষ্য কী?

যখন কোনো রোগীর ক্ষেত্রে রি-অপারেশন নিরাপদ বলে মনে করা হয়, তখন এর মূল লক্ষ্যগুলো থাকে:

  1. টিউমারের ভর বা আকার কমানো (Debulking): টিউমার বড় হয়ে মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করলে মাথাব্যথা, বমি বা খিঁচুনির মতো মারাত্মক লক্ষণ দেখা দেয়। অপসারিত হলে এই চাপ (Intracranial Pressure) কমে।
  2. অন্যান্য চিকিৎসার পথ সুগম করা: সার্জারির মাধ্যমে টিউমারের আকার ছোট করে ফেললে পরবর্তীতে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি বা টার্গেটেড থেরাপি অনেক বেশি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
  3. জীবনের মান উন্নত করা (Quality of Life): স্নায়বিক সমস্যা বা শারীরিক দুর্বলতা কমিয়ে রোগীকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে আনা।
  4. নতুন বায়োপসি ও মলিকুলার টেস্ট: পুনরায় অপারেশন করে পাওয়া টিস্যু থেকে বায়োপসি করে জানা যায় টিউমারের মিউটেশন বা ধরণ বদলেছে কি না, যা নতুন কোনো আধুনিক ওষুধ ব্যবহারে সাহায্য করে।

৪. দ্বিতীয়বার অপারেশনের বিকল্প বা সহযোগী চিকিৎসা পদ্ধতি

কেবল সার্জারিই একমাত্র সমাধান নয়। অনেক সময় দ্বিতীয়বার সার্জারির পাশাপাশি বা সার্জারি ছাড়াই অন্য আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়:

  • স্টেরিওট্যাক্টিক রেডিওসার্জারি (SRS / Gamma Knife): এটি কোনো রক্তপাত ছাড়া অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন দিয়ে টিউমার দূর করার আধুনিক পদ্ধতি।
  • রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি: টিউমার কোষ মেরে ফেলতে বা বৃদ্ধি থামাতে ওষুধ ও রেডিয়েশনের ব্যবহার।
  • টার্গেটেড ও ইমিউনোথেরাপি: টিউমারের নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে আধুনিক প্রযুক্তির ওষুধ প্রয়োগ।

৫. সাধারণ জিজ্ঞাসা ও উত্তর (FAQ)

প্র: দ্বিতীয়বার ব্রেন সার্জারি করা কি প্রথমবারের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?

উ: হ্যাঁ, সাধারণত দ্বিতীয় সার্জারি কিছুটা জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়। কারণ প্রথম সার্জারির স্থানে স্কার টিস্যু (Scar tissue) তৈরি হয় এবং পূর্ববর্তী রেডিওথেরাপির কারণে টিস্যুগুলো স্পর্শকাতর থাকে। তবে অভিজ্ঞ নিউরোসার্জন এবং আধুনিক প্রযুক্তির (যেমন- Neuronavigation, Intraoperative MRI) সাহায্যে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

প্র: ব্রেন টিউমার কতবার পর্যন্ত অপারেশন করা যায়?

উ: এর কোনো নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা বা সীমা নেই। রোগীর সুস্থতা, মানসিক বল এবং রোগের স্বভাবের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে ২ থেকে ৩ বার বা তারও বেশি অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

প্র: দ্বিতীয়বার সার্জারি করার পর কি টিউমার সম্পূর্ণ সেরে যায়?

উ: এটি টিউমারের বায়োপসি রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে। বিনাইন টিউমার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া গেলে রোগী দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে পারেন। কিন্তু ক্যানসারযুক্ত বা হাই-গ্রেড টিউমারের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য থাকে টিউমার নিয়ন্ত্রণ করা ও রোগীর আয়ু এবং জীবনমান বৃদ্ধি করা।

প্র: লক্ষণ দেখে কীভাবে বুঝব ব্রেন টিউমার আবার ফিরে এসেছে?

উ: নতুন করে বা তীব্র মাথাব্যথা, বারবার খিঁচুনি হওয়া, হাত-পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা বা ব্যবহারে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে অবিলম্বে এমআরআই (MRI) স্ক্যান করানো উচিত।

শেষ কথা

ব্রেন টিউমার আবার ফিরে আসা নিঃসন্দেহে একটি মানসিক ও শারীরিকভাবে কঠিন অভিজ্ঞতা। তবে আধুনিক নিউরোসার্জারি, উন্নত প্রযুক্তির নিউরোনাভিগেশন এবং বহুমুখী চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে বর্তমানে দ্বিতীয়বার অপারেশন অত্যন্ত নিখুঁত ও সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।

টিউমার ফিরে আসার লক্ষণ বা স্ক্যানে এমন কিছু ধরা পড়লে হতাশ না হয়ে দ্রুত অভিজ্ঞ নিউরোসার্জনের পরামর্শ নিন এবং একটি সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনা গ্রহণ করুন।